পোয়েট ট্রি





যাই, যাই // শহীদ কাদরী

আজ আবার আমার ইচ্ছা হলো যাই
বর্ধমানে, সেই একটুখানি ইস্টিশনে,
হাই তুলতে তুলতে যাই বটগ্রামে শিউলিতলায়
যেখানে দাঁড়িয়ে আমি কোনওদিন ফটোগ্রাফ তুলি নাই
হে আমার মোরগের চোখের মতন খুব ছেলেবেলা !

চলো তাকে তুলে আনি, তবু বলো
আগে কেন আনি নাই ? অথচ স্বপ্নের মধ্যে
শিউলি-গাছের মতো আমার মা দারুন সুগন্ধ
সঙ্গে নিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে টান দেন কনিষ্ঠ আঙুল
কপিকলে উঠে-আসা মধ্যাহ্নে কুয়োর ঠাণ্ডা পানি
আমাকে আবার তুলে দ্যায় নতুন শরীর ধরে
সেই সুপ্রাচীন সাঁওতাল তার ছবি নেই কেন
এ্যালবামে ? সে কি শিমুলের মতো উড়ে
চলে গেছে শালবনে ? কণ্ঠ তার মহুয়ায়
মাদলের বোলে, জন্মে-জন্মে, অন্য কোনও জন্মান্তরে
জাগ্রত হবে না আর ? যদি হয়, আজ তাই
যা কিছু এড়িয়ে গেছি, আড়ালে রেখেছি
আমার নিজের মধ্যে, কবিতার ক্লান্ত শব্দে, বারবার
ফিরিয়ে আনতে চাই আজ আবার আমার
ইচ্ছে হলো যাই, এই রঙ-বেরঙের শার্ট-জামা-জুতো,
মাছ থেকে মাছের আঁশের মতো কৌশলে ছাড়াই ... যাই ...

একটি নতুন নম্র বীজ হয়ে, বকুল অথবা
চামেলীর ছদ্মবেশে এক্কেবারে শব্দহীন চলে যাই



নদীর পাশে একা // আবু হাসান শাহরিয়ার

আমার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল পথ
পথের পাশে নদী
নদীর পাশে নৌকাবাঁধা ঘাট
ঘাটের পাশে শেষপারানির কড়ি
গাছঠাকুরের পুজো
দাঁড়িয়ে ছিল হাজার অমারাত
দেউটি হাতে একলা মাঠের চাঁদ
দূরে কোথাও বৃষ্টিভেজা ঘর
টিনের চালে বিঠোফেনের চিঠি
কোথাও একটা জানলা খুলে রাখা
কোথাও একটা কাঁকন-পরা হাত
কোথাও একটা উড়ে যাবার সাধ
দাঁড়িয়ে ছিল কেমন-করা মন
মনের তলে মনের তলদেশ
তার অতলে হঠাৎ কারও মুখ
হঠাৎ কারও রাত্রি-চেরা ডাক
হঠাৎ কোনও নারিকেলের পাতা
ঠাণ্ডা-লাগা একজোড়া টনসিল
দাঁড়িয়ে ছিল ভুবনজোড়া মায়া
অষ্টরানির মৃত স্বামীর ছবি
শাদা ফ্রকের রিবন-বাঁধা চুল
কোল-বদলের ধূসর ছেলেবেলা
অতীত-করা হাজার গতকাল
আষাঢ়-করা শ্রাবণ-করা মন

আমার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল পথ
পথের পাশে নদী
নদীর পাশে মানুষ কেন একা ?

মানুষ কেন একা ?




দেখে নেবেন
// তুষার রায়


বিদায় বন্ধুগণ, গনগনে আঁচের মধ্যে
শুয়ে এই শিখার রুমাল নাড়া নিভে গেলে
ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন পাপ ছিল কিনা

এখন আমার কোনো কষ্ট নেই, কেননা আমি
জেনে গিয়েছি দেহ মানে কিছু অনিবার্য পরম্পরা
দেহ কখনো প্রদীপ সলতে ঠাকুর ঘর
তবু তোমরা বিশ্বাস করোনি
বার বার বুক চিরে দেখিয়েছি প্রেম, বারবার
পেশী অ্যানাটমি শিরাতন্তু দেখাতে মশায়
আমি গেঞ্জি খোলার মত খুলেছি চামড়া
নিজেই শরীর থেকে টেনে

তারপর হার মেনে বিদায় বন্ধুগণ,
গনগনে আঁচের মধ্যে শুয়ে এই শিখার
রুমাল নাড়ছি
নিভে গেলে ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন
পাপ ছিল কিনা




মৃত্যুঞ্জয়ী : ১৭ // নির্মল হালদার

ঝড়ের মধ্যে ধুলো হয়ে ঘুরতে ঘুরতে
তুমি এসেছ আমার ভাতের থালায়
আমার সারাদিন উপোস গেল

তবু তুমি এসেছ, বসেছ ভাতের থালায়
এ যে কী আনন্দ আমার
আমি আবার যাবো ভিক্ষে করতে

আবার সাজাবো ভাতের থালা



অপমানের জন্য ফিরে আসি // কবিতা সিংহ

অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
আমার অপমানের প্রয়োজন আছে !

ডাকেন মুঠোয় মরীচিকা রেখে
মুখে বলেন বন্ধুতার ___ বিভূতি ___
আমার মরীচিকার প্রয়োজন আছে

অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
উচ্চৈঃশ্রবা বিদূষক-সভায়
শাড়ি স্বভাবতই ফুরিয়ে আসে
আমার যে
কার্পাসের সাপ্লাই মেলে না

অপমানের জন্য বার বার ডাকেন
ফিরে আসি
ঝাঁপ খুলে লেলিয়ে দেন কলঙ্কের অজস্র কুক্কুর ___
আমার কলঙ্কের প্রয়োজন আছে !

যুদ্ধরীতি পাল্টানোর কোনও প্রয়োজন নেই
তাই করমর্দনের জন্য
হাত বাড়াবেন না
আমার করতলে কোনও অভিচিক্কন কোমলতা নেই



রাত্রির শিলালিপি // রহমান হেনরী

ফিনকি-ছোটা তাজা রক্তের চেয়েও টকটকে লাল এই রাত্রি মহাজাগতিক বা আরোপিত আর কোনও রঙেরই মিশ্রণ নেই
গরমে টগবগ করে ফুটছে মানুষের স্বপ্ন আর আয়ূ চার হাজার চার শ চল্লিশতম জন্মদিন আজ বাতাসের
চারপাশে আমার বন্ধুরা ___ বাৎসল্য আর ভালোবাসায় চক্রব্যুহ হয়ে আছে
ভালো হতো, আরও কয়েক টুকরো বরফ যোগ হলে পানপাত্রে

কারও সাথেই আজ ভাবনা শেয়ার করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে এই রাত্রির কসম ___
বিতরণমুলক প্রকাশও আমি সমর্থন করছি না মানুষমাত্রই বণিক আর ঝুঁকে পড়ছে
ধাতব ব্যবসার দিকে ধাতবে আস্থা হারিয়েছি আমি আরও বেশ আগেই
বিশেষ প্রকৃতির এক শিলাখণ্ড খুঁজতে খুঁজতেই তো কেটে গেল আমার এতোগুলো বছর!
প্রাচীনতম সভ্যতা থেকে মানুষের কুড়িয়ে আনা সবগুলো পাথরই আমি পরখ করে দেখেছি

আমার পছন্দ-তালিকার কোনওটিরই আত্মীয়ও নয় এরা
কী ভয়ানক এক অস্বস্তি-তাড়িত আমি সারাটা জীবন!
শুধু একটুকরো পাথরের খোঁজে___ এমনকী,
আটলান্টিকের তলদেশ ভ্রমনেও আপত্তি ছিলো না আমার

বন্ধুরা সব কবিতা-মশগুল আর নিরর্থক উল্লাসেই ঠোকাঠুকি করছে
পরস্পরের পানপাত্র কী বিশ্রী আর বিশৃঙ্খল সেই আওয়াজ ___ ছন্দোহীন___
বরং এই রাত্রিকে প্রতারিত করবার পক্ষেই তা উপযোগী ও মোক্ষম

বল্কল, প্যাপিরাস, কাগজ আর মুদ্রণের দুনিয়া ফুরিয়ে আসছে দ্রুত
দ্বিতীয় মহাজাগতিকে টিকে থাকবে___ এমন এক টুকরো সিলিকনিক শিলাখণ্ড
আমার চাই-ই চাই আর এই রাত্রির চেয়ে উপযুক্ত উপলখণ্ড কী-ই বা হতে পারে !

প্রিজমের মতো বহুকৌণিক আমার স্বপ্ন আর ভাবনাগুলো এখন
ক্রমাগত তীরবিদ্ধ করছে আমাকেই অবারিত বিলের ঢেউ থেকে তুলে এনে
যে ভাবনাগুলোকে একদা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম লেকের রুগ্ন জলে;
আজ রাত্রে তারা বিদ্রোহে ফেটে পড়ছে পেরুর গেরিলাদের মতো

তারা সব সম্মিলিত আত্মাহুতিতে যাবার আগেই, এক্ষুণি,
ভাবনাগুলোকে উৎকীর্ণ করে যেতে চাই আমি ___
রক্তাক্ত, লাল রঙের, শিলাময়,
অবিনাশী এই রাত্রিরই লোভনীয় আঁচলের সংগুপ্ততায় ...

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন